সপ্তম অধ্যায়: গ্যাসীয় বিনিময় (class 10)
সপ্তম অধ্যায়: গ্যাসীয় বিনিময়
(Gaseous Exchange)
১. গ্যাসীয় বিনিময় কী?
সংজ্ঞা:
জীবদেহ ও পরিবেশের মধ্যে অক্সিজেন (O₂) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) গ্যাসের আদান-প্রদান প্রক্রিয়াকে গ্যাসীয় বিনিময় বলে।
সহজভাবে:
পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ + দেহ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ = গ্যাসীয় বিনিময়
২. গ্যাসীয় বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা
জীবদেহের কোষে শক্তি উৎপাদনের জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন।
কোষীয় শ্বসনে:
গ্লুকোজ + অক্সিজেন
↓
কার্বন ডাই-অক্সাইড + পানি + শক্তি (ATP)
তাই:
অক্সিজেন গ্রহণ করতে হয়।
কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দিতে হয়।
৩. শ্বসন ও গ্যাসীয় বিনিময়ের সম্পর্ক
অনেকে শ্বসন ও গ্যাসীয় বিনিময়কে একই মনে করে, কিন্তু দুটি ভিন্ন বিষয়।
গ্যাসীয় বিনিময়:
O₂ ও CO₂-এর আদান-প্রদান।
শ্বসন:
কোষের ভিতরে খাদ্য ভেঙে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া।
সম্পর্ক:
গ্যাসীয় বিনিময়
↓
অক্সিজেন সরবরাহ
↓
কোষীয় শ্বসন
↓
ATP উৎপাদন
৪. জীবের গ্যাসীয় বিনিময়ের পদ্ধতি
বিভিন্ন জীব বিভিন্নভাবে গ্যাস বিনিময় করে।
১. এককোষী জীব
যেমন:
অ্যামিবা
এদের দেহ খুব ছোট হওয়ায় সরাসরি বিসরণের (Diffusion) মাধ্যমে গ্যাস বিনিময় হয়।
বিসরণ (Diffusion)
সংজ্ঞা:
কোনো পদার্থের অণু বেশি ঘনত্বের স্থান থেকে কম ঘনত্বের স্থানে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বিসরণ বলে।
গ্যাসীয় বিনিময়ের মূল ভিত্তি হলো বিসরণ।
২. উদ্ভিদের গ্যাসীয় বিনিময়
উদ্ভিদে গ্যাস বিনিময় হয়:
পাতা
কাণ্ড
মূল
এর মাধ্যমে।
পাতায় গ্যাসীয় বিনিময়
পাতার বিশেষ ছিদ্রকে বলে:
রন্ধ্র (Stomata)
৫. রন্ধ্র (Stomata)
সংজ্ঞা:
পাতার ত্বকে অবস্থিত ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে গ্যাসের আদান-প্রদান হয়, এগুলোকে রন্ধ্র বলে।
রন্ধ্রের গঠন:
একটি রন্ধ্র গঠিত:
১. রন্ধ্র ছিদ্র
২. দুটি প্রহরী কোষ (Guard cell)
প্রহরী কোষের কাজ:
রন্ধ্র খোলা ও বন্ধ নিয়ন্ত্রণ করে।
পানি ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করে।
রন্ধ্রের মাধ্যমে:
দিনে:
CO₂ প্রবেশ করে
O₂ বের হয়
(সালোকসংশ্লেষণের সময়)
রাতে:
O₂ গ্রহণ
CO₂ ত্যাগ
(শ্বসনের সময়)
৬. প্রাণীর গ্যাসীয় বিনিময়
উন্নত প্রাণীদের জন্য বিশেষ শ্বাসযন্ত্র রয়েছে।
উদাহরণ:
মাছ → ফুলকা
পোকামাকড় → ট্রাকিয়া
মানুষ → ফুসফুস
৭. মানুষের শ্বাসযন্ত্র (Human Respiratory System)
মানুষের শ্বাসযন্ত্রের প্রধান অংশ:
১. নাসারন্ধ্র
২. নাসাপথ
৩. গলবিল
৪. স্বরযন্ত্র
৫. শ্বাসনালি
৬. ব্রংকাস
৭. ফুসফুস
৮. বায়ুথলি (Alveoli)
৮. নাসারন্ধ্র (Nostril)
কাজ:
বাতাস গ্রহণ করে।
ধুলা ও জীবাণু আটকায়।
বাতাসকে উষ্ণ ও আর্দ্র করে।
৯. শ্বাসনালি (Trachea)
কাজ:
নাক থেকে ফুসফুসে বাতাস পৌঁছে দেয়।
এর ভিতরে থাকে:
শ্লেষ্মা
সিলিয়া
যা ধুলা আটকাতে সাহায্য করে।
১০. ফুসফুস (Lung)
মানুষের প্রধান শ্বাস অঙ্গ হলো ফুসফুস।
মানুষের দুটি ফুসফুস থাকে:
ডান ফুসফুস
বাম ফুসফুস
১১. বায়ুথলি বা অ্যালভিওলাই (Alveoli)
ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলিকে অ্যালভিওলাই বলে।
এখানেই প্রকৃত গ্যাসীয় বিনিময় ঘটে।
অ্যালভিওলাইয়ের বৈশিষ্ট্য:
দেয়াল খুব পাতলা।
চারপাশে কৈশিক নালি থাকে।
পৃষ্ঠতল বেশি।
এগুলো দ্রুত গ্যাস বিনিময়ে সাহায্য করে।
১২. অ্যালভিওলাইতে গ্যাস বিনিময়
অক্সিজেন:
অ্যালভিওলাই
↓
রক্ত
↓
দেহকোষ
কার্বন ডাই-অক্সাইড:
দেহকোষ
↓
রক্ত
↓
অ্যালভিওলাই
↓
বাইরে
১৩. শ্বাসক্রিয়ার ধাপ
শ্বাসক্রিয়া দুই ভাগে বিভক্ত:
১. শ্বাস গ্রহণ (Inspiration)
বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করে।
সময়:
ডায়াফ্রাম নিচে নামে।
বুকের খাঁচা প্রসারিত হয়।
২. শ্বাস ত্যাগ (Expiration)
বাতাস ফুসফুস থেকে বের হয়।
সময়:
ডায়াফ্রাম উপরে উঠে।
বুকের খাঁচা সংকুচিত হয়।
১৪. মানুষের শ্বাসক্রিয়া (Respiration in Human)
মানুষের শ্বাসক্রিয়া হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে:
পরিবেশ থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করা হয়।
দেহ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়া হয়।
মানুষের শ্বাসক্রিয়া প্রধানত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
১. বায়ু গ্রহণ ও ত্যাগ
২. ফুসফুসে গ্যাসীয় বিনিময়
৩. কোষে অক্সিজেন ব্যবহার
১৫. শ্বাস গ্রহণ (Inspiration)
সংজ্ঞা:
পরিবেশ থেকে অক্সিজেনযুক্ত বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করার প্রক্রিয়াকে শ্বাস গ্রহণ বলে।
শ্বাস গ্রহণের সময় কী ঘটে?
১. ডায়াফ্রাম সংকুচিত হয়
ডায়াফ্রাম নিচের দিকে নেমে যায়।
বুকের গহ্বরের আয়তন বৃদ্ধি পায়।
২. আন্তঃপাঁজর পেশি (Intercostal muscle) কাজ করে
পাঁজরের হাড় উপরে ও বাইরে দিকে সরে যায়।
বুকের খাঁচা বড় হয়।
৩. ফুসফুস প্রসারিত হয়
ফুসফুসের ভেতরের চাপ কমে যায়।
ফলে:
বাইরের বাতাস → ফুসফুসে প্রবেশ করে।
১৬. শ্বাস ত্যাগ (Expiration)
সংজ্ঞা:
ফুসফুস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইডযুক্ত বাতাস বাইরে বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে শ্বাস ত্যাগ বলে।
শ্বাস ত্যাগের সময়:
১. ডায়াফ্রাম শিথিল হয়
উপরের দিকে উঠে আসে।
২. বুকের গহ্বর ছোট হয়।
৩. ফুসফুস সংকুচিত হয়।
ফলে:
ফুসফুসের বাতাস → বাইরে বের হয়ে যায়।
১৭. ডায়াফ্রাম (Diaphragm)
সংজ্ঞা:
বুক ও উদর গহ্বরকে পৃথককারী পেশিবহুল পর্দাকে ডায়াফ্রাম বলে।
কাজ:
শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগে সাহায্য করে।
ফুসফুসের আয়তন পরিবর্তন করে।
১৮. ফুসফুসে গ্যাসীয় বিনিময়
ফুসফুসের অ্যালভিওলাইতে প্রকৃত গ্যাস বিনিময় ঘটে।
অ্যালভিওলাইয়ের চারপাশে থাকা কৈশিক নালির মাধ্যমে এই বিনিময় হয়।
অক্সিজেনের পথ:
বায়ু
↓
অ্যালভিওলাই
↓
রক্ত
↓
হিমোগ্লোবিন
↓
দেহকোষ
কার্বন ডাই-অক্সাইডের পথ:
দেহকোষ
↓
রক্ত
↓
অ্যালভিওলাই
↓
শ্বাস ত্যাগের মাধ্যমে বাইরে
১৯. অক্সিজেন পরিবহন
রক্তের লোহিত রক্তকণিকা (RBC)-এর মধ্যে থাকা হিমোগ্লোবিন অক্সিজেন পরিবহন করে।
হিমোগ্লোবিন (Haemoglobin)
হিমোগ্লোবিন হলো লৌহযুক্ত প্রোটিন।
এর কাজ:
অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হওয়া।
দেহের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া।
অক্সিজেন পরিবহন:
ফুসফুসে:
হিমোগ্লোবিন + অক্সিজেন
↓
অক্সিহিমোগ্লোবিন
দেহকোষে:
অক্সিহিমোগ্লোবিন
↓
হিমোগ্লোবিন + অক্সিজেন
অক্সিজেন কোষে প্রবেশ করে।
২০. কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবহন
কোষীয় শ্বসনের ফলে উৎপন্ন CO₂ রক্তের মাধ্যমে ফুসফুসে আসে।
এরপর:
ফুসফুস → শ্বাসনালি → বাইরে
২১. কোষীয় শ্বসন (Cellular Respiration)
কোষের ভিতরে খাদ্য ভেঙে শক্তি উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে কোষীয় শ্বসন বলে।
সমীকরণ:
গ্লুকোজ + অক্সিজেন
↓
কার্বন ডাই-অক্সাইড + পানি + শক্তি (ATP)
২২. উদ্ভিদ ও প্রাণীর গ্যাসীয় বিনিময়ের তুলনা
| বিষয় | উদ্ভিদ | প্রাণী |
|---|---|---|
| গ্যাস বিনিময়ের স্থান | রন্ধ্র, লেন্টিসেল | ফুসফুস/ফুলকা |
| প্রধান গ্যাস | O₂ ও CO₂ | O₂ ও CO₂ |
| পরিবহন | বিসরণ | শ্বাসযন্ত্র ও রক্ত |
| নিয়ন্ত্রণ | রন্ধ্র দ্বারা | শ্বাসক্রিয়া দ্বারা |
২৩. শ্বাসযন্ত্রের রোগ
১. হাঁপানি (Asthma)
কারণ:
অ্যালার্জি
ধুলা
ধোঁয়া
লক্ষণ:
শ্বাস নিতে কষ্ট
বুক চাপ অনুভব
কাশি
২. নিউমোনিয়া (Pneumonia)
কারণ:
জীবাণুর সংক্রমণ।
লক্ষণ:
জ্বর
কাশি
শ্বাসকষ্ট
৩. ব্রংকাইটিস (Bronchitis)
কারণ:
ব্রংকাসে প্রদাহ।
লক্ষণ:
দীর্ঘস্থায়ী কাশি
শ্বাসকষ্ট
৪. যক্ষ্মা (Tuberculosis)
কারণ:
ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।
প্রধান লক্ষণ:
দীর্ঘদিন কাশি
ওজন কমে যাওয়া
দুর্বলতা
২৪. ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব
ধূমপান শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
ক্ষতি:
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমায়।
ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে।
২৫. গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন
১. গ্যাসীয় বিনিময় কী?
উত্তর:
অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের আদান-প্রদান প্রক্রিয়াকে গ্যাসীয় বিনিময় বলে।
২. অ্যালভিওলাই কেন গ্যাস বিনিময়ের জন্য উপযোগী?
উত্তর:
কারণ:
দেয়াল পাতলা।
চারপাশে কৈশিক নালি থাকে।
পৃষ্ঠতল বেশি।
৩. হিমোগ্লোবিনের কাজ কী?
উত্তর:
হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে দেহের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহন করে।
৪. ডায়াফ্রামের কাজ কী?
উত্তর:
ডায়াফ্রাম সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগে সাহায্য করে।
Comments
Post a Comment
Thanks